শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

স্বাধীনতা সংগ্রামে চরমোনাই’র ভূমিকা: অধ্যাপক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন


ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের এই দেশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত হয় এবং বাংলার হৃদপি-ে টকটকে লাল স্বাধীনতার সূর্য উদ্ভাসিত হয়। বিশ্বের দরবারে আমাদের আত্মপরিচয় ঘটে স্বাধীন জাতি হিসেবে। স্বাধীনতা প্রতিটি জাতির গৌরব ও অহংকারের বিষয়।
৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমের লড়াই। পাকিস্তানীরা ছিল জালিম আর এদেশের নিরীহ মানুষ ছিল মাজলুম। সুস্থ-বিবেকসম্পন্ন কোন মানুষ কখনো জালেমের পক্ষাবলম্বন করতে পারে না। মাজলুমকে সাহায্য করা, তাদের পক্ষে কথা বলা এটাই মনুষ্যত্বের পরিচয় এবং ঈমানী দায়িত্ব। আর সে জন্যই এদেশের আলেমসমাজ ও এদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে পাকিস্তানী জালিম শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রাজপথে যুদ্ধ করেছেন। কাজ করেছেন দেশপ্রেমিক হয়ে। অসংখ্য উলামায়ে কেরাম তাদের জান-মাল, সব শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে এ দেশের মাজলুম জনগণের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে উলামায়ে কেরামের অবদান অনস্বীকার্য। আজাদী আন্দোলন, সিপাহী বিপ্লব, ইংরেজ খেদাও আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ দেশ ও জনগণের স্বার্থে সকল প্রকার সংগ্রামে আলেমসমাজ ছিলেন অগ্রগামী। এসব ওলামা হজরতের নির্দেশনায় হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমিও এই ইতিহাসের ক্ষুদ্র একটি অংশ। আমার প্রেরণার উৎস ছিলেন আল্লামা হাফেজ্জী হুজুর, হজরত মাওলানা সৈয়দ ইসহাক, পীর সাহেব চরমোনাই রহ.। তাঁরা জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের এই সংগ্রামে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। পীর, আউলিয়া বুজুর্গের দেশ, আমাদের মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশ। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ন্যায় এখানে আলেম ওলামা, পীর-বুজুর্গদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
১৬ ডিসেম্বর আমাদের চেতনাকে শাণিত করে। যুদ্ধের হাজারো স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। আমি তখন একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কিশোর সন্তান। ১৯৬৯ সাল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্বপাকিস্তানের অবস্থা মারাত্মক নাজুক। পূর্বপাকিস্তানের ৭ কোটি বাঙ্গালী পশ্চিমা হানাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে। দেশের অবস্থা ভাল না। জনতার অধিকার আদায়ের জন্য সংঘবদ্ধ হচ্ছে। জনতার প্রতিবাদ-সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণে জেলায় জেলায় পাক বাহিনী নেমে পড়ছে। আমাদের মহকুমায় (মাদারীপুরে) যেকোন সময় হায়েনারা ঢুকে পড়বে। ছোট দুই ভাই হবি আর মজিবকে ডেকে তাদের মিয়া ভাই অর্থাৎ আমার বাবা মরহুম সৈয়দ হাবিবুল্লাহ বললেন, ঘরের সকল পাট রোদ্রে দাও, বিকেলে মস্তফাপুর হাটে পাট বিক্রি করতে হবে। ছোট কাকু সৈয়দ সাদিক জাহিদুল ইসলাম মজিব (বর্তমানে ভাইস প্রিন্সিপাল, ঢাকা সরকারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) বেলা ১২টার দিকে দৌড়ে এসে বাবাকে বললেন, মিয়া ভাই হাজা ভাই তার বন্ধুদের সাথে কোথায় যেন চলে গেছে। অর্থাৎ আমার বড় কাকু মাস্টার সৈয়দ শফিউল আলম কাউকে কিছু না জানিয়ে তার নেতৃত্বে ওরা ৯জন পাক হায়েনাদের হাত হতে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের তিন মাসের সে ঘটে যাওয়া কাহিনী আজও মনে পড়লে লোম শিউরে ওঠে। যাত্রা পথে জীবন নাশের উপক্রম, যশোর ক্যান্টনমেন্টের সামনে মহাবিপদের সম্মুখিন হওয়া, যেতে না পারার ভয়ে প্রত্যেকেই বাড়িতে কিছু না বলে শুধু গামছা সাথে নিয়ে খেয়ে-না খেয়ে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে তিনরাত তিনদিন শেষে বনগাঁ বর্ডার পার হয়ে মাদারীপুরের কালকিনীর মতি উকিলের দায়িত্বে ট্রানজিট ক্যাম্প চাঁদপাড়ায় ওরা নয়জন গিয়ে ওঠে। মাঝে টাকিপুরে মেজর এম এ জলিল-এর ক্যাম্পে পাঠানো হলে সেখানে শুধু বরিশাল বিভাগের ট্রেনিং হয় বলে তাঁদের চাঁদপুর ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৮নং সেক্টর আগরতলায় গিয়ে ওঠে। ১১০০ মুক্তিযোদ্ধার বিশাল বহরে ওরা নয়জন উড়িস্যা, বিহার, গোহাটি হয়ে ত্রিপুরার আগরতলায় আসে। ভুট্টার ছাতু আর পোকামিশ্রিত কালো রুটিই ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবন সাথী। দীর্ঘ ২ মাস ২৯ দিন হাসানিয়া ক্যাম্পে অবস্থান, বাঘমারা ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষে মেলাঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়ে।
বীরমুক্তিযোদ্ধা মাস্টার সৈয়দ শফিউল আলম হবি, মো. ইসলাম মোল্লা, মো. মওলা দর্জি, কাশেম ফকীর, শেখ মোক্তার আলী, শেখ আমীর আলী, আ. বারেক মাতুব্বর, মো. হারিস হাওলাদার, দেলোন হাওলাদার। মাদারীপুরের ঝিকরহাটি গ্রামের উত্তর কান্দির ওরা নয়জন কালের তলানীতে হারিয়ে যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা। যাদের ছয়জনই আমার নিকটতম আত্মীয় ছিলেন। তাঁদের বীরত্বগাঁথা যুদ্ধের ইতিকথা একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার আজও মনে পড়ে। সেদিন কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক হায়েনা ও রাজাকার মুক্ত করতে যে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশনে অংশ নিয়েছিল, তাদের মাঝে গ্রুপক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ আলীর নেতৃত্বে ওরা নয়জনও ছিল। প্রায় ৪০০ জন মুক্তিযোদ্ধা কয়েক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে জীবন বাজি রেখে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টকে শত্রুমুক্ত করেছিল। তুমুল যুদ্ধ শেষে ১২০০ পাকসেনা, ৭০০ রাজাকার সেদিন আত্মসমর্পণ করেছিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যে স্টেনগানের ব্রাসফায়ারে পাকহায়েনাদের বুককে ঝাঝড়া করেছে, কিশোর যোদ্ধা হিসেবে আমি ঐ স্টেনগান কাঁধে নিয়ে তার ছিদ্র সংখ্যা গুনেছিলাম। পাকবাহিনীর জ্বালিয়ে দেয়া ঘর-বাড়ির করুণ স্মৃতি আজো মনে পরে। সেদিন দূর থেকে অগ্নিদগ্ধ বাড়ি-ঘরের লেলিহান দৃশ্য আমার শৈশবের সেই হৃদয় নিংড়ানো চোখের পানিতে ভস্ম হতে দেখেছিলাম। আমি বৃদ্ধ দাদা মরহুম সৈয়দ বন্দে আলীর হাত ধরে পাক হায়েনাদের হাত হতে ইজ্জতের হেফাজতে মা-বোনদের নৌকার তলায় শুইয়ে বড় ধানক্ষেতের মাঝে বার বার লুকিয়ে রেখেছিলাম। সারা বাংলার কিশোর, আবাল, বৃদ্ধ, বনিতার আত্মাহুতি, রক্ত আর ইজ্জতের দামে কেনা আমাদের গর্বের স্বাধীনতা। যার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার লাখো স্মৃতিকথা।
জাতির এই আত্মত্যাগ, মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম, ৭ কোটি বাঙ্গালীর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবে আজ বড়ই গরমিল। যাদের রক্তসাগর ও কুরবানির বিনিময়ে এই স্বাধীনতা সেসব মুক্তিযোদ্ধারা আজ আশাহত। যারা নিজেদের নীতি নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে স্বার্থের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন, তাদের কথা ভিন্ন। তারা দেশ স্বাধীনের পর থেকে ক্ষমতা, অর্থ, আধিপত্য ও দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে আজ ভালোই আছে। কিন্তু যারা নীতিনৈতিকতাসম্পন্ন, পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী সেসব মুক্তিযোদ্ধা শুধু একটি পতাকা, আলাদা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। যে লক্ষ্যে, যে প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, সেই স্বপ্নের অপূর্ণতা তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এ রকম হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আজ নতুন একটি সংগ্রামের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। জরিপ চালিয়ে দেখুন; ৬৮ হাজার গ্রামে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আত্মশুদ্ধি আর দীন বিজয়ের লক্ষে আজ হজরত পীর সাহেব চরমোনাই’র অনুসারী। তারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দেশ ও মানবতাবিরোধী সকল আগ্রাসনের মোকাবেলায় তাঁর নেতৃত্বে বুদ্ধিভিত্তিক পরিকল্পিত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। নরসিংদীর মেহেরপাড়ার বীরমুক্তিযোদ্ধা মেহেরউদ্দিন চেয়ারম্যান রহ., যিনি ঢাকার কবি নজরুল কলেজের ছাত্রসংসদের দুইবারের ভিপি ছিলেন, ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সভাপতি হিসেবে সর্বদাই আক্ষেপ করে গর্জে উঠে দৃঢ়ভাবে বক্তব্যে বলেছেন, “দেশ স্বাধীন করেও আজ পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ আছি। অস্ত্র জমা দিলেও ট্রেনিং জমা দেইনি, পীর সাহেব চরমোনাই’র নেতৃত্বে আবারো সাথীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করবো। সকল শৃঙ্খল ভেঙ্গে দেশের স্থায়ী শান্তি, মজলুম মানবতার সার্বিক মুক্তি ফিরিয়ে আনবো।”
অনেক দিন আগের কথা, একবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের অভিভাবক, বিশিষ্ট শ্রমিক সংগঠক, সাবেক জাসদ নেতা ও বীরমুক্তিযোদ্ধা- তখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন না, আক্ষেপ/হাসির ছলে মাদারীপুর জেলার তিন মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিক নেতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি সব চরমোনাই হয়ে গেলে, যেখানে যাই সব চরমোনাই, আমাগো জন্য পোস্ট খালি রাইক্ষ্য।’ তখন উক্ত তিন নেতা সর্বজনাব, জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি, মুক্তিযোদ্ধা মতি মাতুব্বর, জেলা ক্ষুদ্র দোকান মালিক সমিতির সেক্রেটারি ও ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের জেলা সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা আ.ওহাব মুন্সি এবং জেলা পাটকল শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সাবেক সেক্রেটারি বীর মুক্তিযোদ্ধা আসমত আলী মিয়া একত্রে বললেন, ‘দাদা! আমরাতো আপনারই ছিলাম, কিন্তু কবরে যে যাওয়া লাগবে, মুসলমান হওয়ার লাইগা চরমোনাই গেছি।’ নেতা-কর্মী সকলকেই ঐ নেতা মহোদয় বললেন, ভাল করছো। চলার পথে ইটের পুলে হঠাৎ সাক্ষাতে দাদা একথা বলে তিনি তার গন্তব্যে চলে গেলেন।
বরিশাল অঞ্চল প্রসিদ্ধ পীর বুজুর্গের অঞ্চল নামে খ্যাত। পাকিস্তান আমল হতেই দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রসিদ্ধ পীর ছিলেন। যাদের অন্যতম একজন হলেন আল্লামা সৈয়দ এছহাক পীর সাহেব চরমোনাই রহ.। তাঁর অবর্তমানে তাঁরই রেখে যাওয়া মজলিসে শুরার বৈঠকে খোলাফাদের সিদ্ধান্তের আলোকে মরহুম পীর সাহেবের দ্বিতীয় ছেলে কুতুবুল আলম মাও. সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. পীর সাহেব চরমোনাই হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। অন্যান্য দরবার বা খানকা থেকে চরমোনাই সর্বদাই ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সারা জীবনের মৌলিক যে চারটি কাজ যথা- দাওয়াত, তালিম (জ্ঞানার্জন), আত্মশুদ্ধি ও জিহাদ ফী-সাবীলিল্লাহ, যা চরমোনাইওয়ালারা সর্বদা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি লাভে তাঁরা দুনিয়ার সরকারের সাথে ওঠা বসা সর্ম্পক রাখাকে সমীচীন মনে করেন না। নামাজ রোজা যেমন ইবাদত তেমনি আত্মশুদ্ধি, ইলম অর্জন ও দীন বিজয়ে পীরমুরিদী, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, দাওয়াত-মাহফিল এবং ইসলামী আন্দোলনের কাজ করাকে চরমোনাইওয়ালারা ঐ ইবাদত মনে করেই করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে চরমোনাই‘র অবদান অবিস্মরণীয়- আশির দশকে হজরত হাফেজ্জী রহ.-এর সাথে চরমোনাই মাহফিলে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে দক্ষিণ বঙ্গের প্রাণপুরুষ, সেক্টর প্রধান মেজর এম এ জলিল রহ.। চরমোনাইতে তিনি জ্বালাময়ী এক ভাষণে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন- ‘সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদী গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষের গড়া এ ব্যর্থ মতাদর্শকে পদদলিত করে, তালাক দিয়ে আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে বিজয়ী করতে হজরত হাফেজ্জী’র নেতৃত্বে আবারো চরমোনাইতে এসেছি, চরমোনাই’র পীর সাহেব হুজুরের সাহায্য সহযোগিতা ও পরামর্শ নিতে। যেমনিভাবে বার বার ছুটে এসেছিলাম অতি আপন এ চরমোনাইতে ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, যখন মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের অভয় আশ্রয়স্থল ছিল আমাদের গর্ব ও ঐতিহ্যবাহী এ চরমোনাই।’
৯১-এর বিএনপি সরকারের আমল। যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাম্বার ওয়ান রাজাকার এম এ মতিন। তসলিমা নাসরিনের ইস্যুতে মানিক মিয়া এভিনিউতে লক্ষ লক্ষ জনতার মহাসমাবেশের ভাষণে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলাম, এমন প্রমাণ কেউ করতে পারলে পল্টন ময়দানে গণমানুষের সম্মুখে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে আমি রাজি। সকল জাতীয় দৈনিক, ইলেকট্্রনিক্স মিডিয়াসহ দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠার তিন কলাম শিরোনামে এ সংবাদ প্রকাশিত হয়।
চরমোনাই সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার অবসান হওয়া জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের সময় চরমোনাই’র পীর সাহেব ও তার অনুসারীরা রাজাকার, আলবদর, আসসামস্ এর ভূমিকা গ্রহণ করেছিল বা তাদের সহযোগিতা করেছে বা পাকিস্তানের পক্ষে দালালি করেছে- এর কোন প্রমাণ নাই। কোন ব্যক্তি যদি কাল্পনিক তথ্য উপস্থান করে; তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চরমোনাইতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন, আছে অনেক হিন্দু পরিবার। প্রয়োজনে চরমোনাইতে এসে তাদের কাছে জানা যাবে যে, ‘চরমোনাই’র পীর সাহেবরা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল কি-না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী’র অতি নিকটতম আত্মীয় ও বরিশালের কিংবদন্তি আ. লীগ নেতা জনাব সিরনিয়াবাদ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ সাহেবকে সকলেরই চিনবার কথা। যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর বরিশাল জেলা মজিব বাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডার (অধিনায়ক) ছিলেন। তাঁরই একান্ত সহযোগী, বরিশাল সদর মজিব বাহিনীর কমান্ডার হলেন চরমোনাই নিবাসী জনাব শাহ জামাল উদ্দিন গাজী। বর্তমানে জনাব জামাল গাজী সাহেব বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বরিশাল জেলা কমান্ডের সহ.কমান্ডার, আওয়ামী লীগ চরমোনাই ইউপি শাখার আহ্বায়ক ও সদর উপজেলা শাখার সহ সভাপতি। ‘মুক্তিযুদ্ধে চরমোনাইর ভূমিকা’ নিয়ে জনাব জামাল গাজীর বক্তব্য রেকর্ড করেছেন হজরত পীর সাহেব চরমোনাই রহ.-এর দীর্ঘদিনের সাথী জনাব ডা. মোখতার হুসাইন, সেক্রেটারি জেনারেল- বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি। জনাব জামাল গাজী সাহেব সুস্পষ্টভাবে তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “চরমোনাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। অসংখ্য হিন্দুসম্প্রদায় চরমোনাই মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পও ছিল এখানে। আশ্রিত সকলের খাবারের ব্যবস্থা হতো চরমোনাই মাদরাসা থেকে”। তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হল, আশ্রিত সংখ্যালঘুরা সেচ্ছায় মুসলমান হতে চাইলে তৎকালিন পীর সাহেব আল্লামা সৈয়দ এসাহাক রহ. বলেছিলেন, এ অবস্থায় আপনাদের মুসলমান হওয়া ঠিক হবে না। দেশ স্বাধীন হলে আর তখন সে¦চ্ছায় মুসলমান হতে চাইলে করা যাবে। হুজুরের একথা আজও মনে পড়লে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি অনেক বেড়ে যায়।
পীর, আউলিয়া, বুজুর্গের দেশ,ধর্মপ্রাণ মুসলমানের গর্বের দেশ আমাদের মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশ। দেশের সকল শ্রেণির, পেশার মানুষের ন্যায় এখানে আলেম ওলামা, পীর-বুজুর্গদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কেউবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেথেকে মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দিয়েছেন। কেউবা পক্ষ বিপক্ষের প্রশ্নে নীরবতা পালন করেছেন। আবার অনেকে অবিভক্ত পাকিস্তান চেয়েছেন। একটি শ্রেণি ইসলামের লেভেল লাগিয়ে পাকিস্তানী হায়েনাদের মদদ দিয়েছিল, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল, নিজেদের দলকে তারা সঠিক ইসলামী দল বলে আজও প্রমাণ করতে পারে নাই। আবার দেশ স্বাধীনের পরে সুবিধাবাদিরা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট কিনে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। আবার কেউ কেউ পাকিস্তানী দালালির কালিমা মুছতে নিজের দোষ অপরের ঘাড়ে সংগোপনে চাপিয়ে দেয়ার কোসেসও করেছে।
হেলিকপ্টার আর জাহাজের নোঙরের স্থান নির্ণয় করতে যারা ভুল করেছেন। তারা নিশ্চয়ই জানেন, দুনিয়াদার রাজা বাদশা বা জেনারেলরা যেখানেই যান সেখানেই এমন উপঢৌকনের চিহ্ন রেখে যান যেন ভবিষ্যত প্রজন্ম ঐ স্মৃতি দেখে তাদের স্মরণ করে। চরমোনাইতে পাকিস্তানের কোন জেনারেল, বাংলাদেশের কোন সরকার প্রধানের নামের কোন উপঢৌকনের ন্যূনতম চিন্হ যেমন খুঁজে পাওয়া যাবে না, তেমনি স্বাধীনতা বিরোধিতার দায়ে পীর সাহেবরা জেলেও যায়নি। তাই দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, “চরমোনাইতে নয় বরং বরিশালের অন্যকোন স্থানে পাকিস্তানের জেনারেলদের হেলিকপ্টার আর জাহাজ বারবার নোঙর গেড়েছিল। যাদের দরবারে পাকিস্তান জেনারেলদের উপঢৌকন হিসেবে আয়ুব হল, মোনায়েম হলের স্মৃতিচিহ্ন এখনো আছে। দেশ স্বাধীনের পরে তারা জেলে গিয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমায় মুক্তিও পেয়েছিলেন।
এই তরিকা প্রকৃত মুসলমান হয়ে কবরে যাওয়ার লক্ষ্যে সর্বদাই ভেজালমুক্ত ইবাদত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাই পাকিস্তান আমল হতে আজ অবধি কোন সরকারের সাথে চরমোনাই পীর সাহেবদের সম্পর্ক গড়া, রাখা বা আসা-যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটাই ধ্রুব সত্য ও দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার