শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

লংমার্চ নিয়ে বিশেষ রচনা-লিখেছেন, সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ


১৯৯২ থেকে ২০১৬ সাল|| শায়খুল হাদীস থেকে পীর সাহেব চরমোনাই।১৯৯২ সাল। ২৩ বছর আগের আজকের মতো এক শহীদী কাফেলার গল্প শুনাব আপনাদের। একজন দলীয় নেতা শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ লংমার্চের কথা নিশ্চয় মনে আছে অনেকেরই।

যদিও টিএনএজ তরুণদের অনেকের স্মৃতিতে নেই সেই শৈশবের ঐতিহাসিক লংমার্চ। আজ যারা যুবক তাদের জন্য এই লংমার্চে ইতিহাসের সাক্ষী হবার সুর্বণ সুযোগ। কারণ বাংলাদেশে আরেকটি ইতিহাসের সূচনা হচ্ছে রাত পোহালেই। যে লংমার্চ দলমতের উর্ধ্বে এক ঐতিহাসিক কাফেলায় রূপ লাভ করেছিল।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তত্বাবধানে শায়খুল হাদীসের লংমার্চের পর বিদেশ অভিমূখে এটা দেশের দ্বীতিয় কোন লংমার্চ। প্রতিবেশি দেশে মুসলমানদের উপসনালয় বাবরী মসজিদ হত্যার প্রতিবাদে ভারতের অযোধ্যা অভিমূখে ছুটেছিল লাখো জনতার ঈমানদীপ্ত কাফেলার জিন্দাদিল মোজাহিদরা।

আর আগামিকাল ১৮ডিসেম্বর ২৩বছর পর আরেকজন দলীয় নেতা সৈয়দ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাইর নেতৃত্বে মায়ানমার অভিমূখে হাজার হাজার মুমিন মুসলমান হত্যার প্রতিবাদে আরেকটি ঐতিহাসিক লংমার্চের ডাক দিয়েছেন। হযরত উমর রাযিঃ এর হাদীস কাবা থেকে সম্মানীত মুমিন। তাই নিঃসন্দেহে বাবরী মসজিদ লংমার্চ থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন ও বর্বর হত্যার প্রতিবাদে লংমার্চ বেশি গুরুত্ববহন করে। তাই দলমত নির্বিশেষে এবারো আগামি কাল তাওহিদী জনতা ছুটবে পীর সাহেবের নেতৃত্বে মিযানমার অভিমূখে লংমার্চে।

আজ থেকে ২৩ বছর আগে ভারত অভিমূখে আলেমদের নেতৃত্বে লংমার্চে বাঁধা দিতে তৎকালিন বিএনপির খালাদা সরকারেরর পেটুয়া পুলিশ বাহিনী সরাসরি গুলি বর্ষন করে আলেম ও তাওহিদী জনতার বুকে। ভারতকে খুশি করতে এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে আলেমদের বুকে সরাসরি গুলি চালানোর প্রথম ন্যক্কট দুঃসাহসিক ইতিহাস সৃষ্টি করে বিএনপি ও খালেদা সরকার। এর আগে এমন সাহস কেউ বাংলার বুকে করে নি।

আমরা আশা করি বিএনপি সরকারের মতো আওয়ামিলীগ ও শেখ হাসিনা সরকার ইতিহাসের পূনরাভিত্তি ঘটাবে না। লংমার্চে বাঁধা আসবে নিশ্চিত। তবে সেটা যেন হয় শান্তিপূর্ণভাবে। হয়তো চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নদীর ব্রীজ পেরোনো স্বম্ভব নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে তাওহিদী জনতার করনীয় হল আবেগকে নিয়ন্ত্রন করে আমিরুল মিজাহিদন পীর সাহেবের যেকোন কমাণ্ডকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। তিনি বসে যেতে বললে যুক্তিছাড়াই সেখানে শান্তভাবে বসে যাওয়া। আর নাফ নদী সাতরিয় পাড়ি দিতে চাইল নিসংকোচে, নির্দ্বিধায় পানিতে ঝাপ দেয়া।
সর্বক্ষেত্রে লংমার্চ কাফেলার আমিরকে এতেয়াত করতে হবে।
_______________
শুনুন বাবরী মসজিদ অভিমূখে লংমার্চের শহীদি কাফেলার গল্প। সেই ইতিহাস। প্রেরণা ও দিক-নির্দেশনা পারেন আপনিও। লেখাটি লম্বা হলেও লংমার্চ কর্মিদের জন্য প্রেরনাদায়ক হবে আজকের দিনে।

২রা জানুয়ারি, ১৯৯২সাল। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে। শুধু মানুষ আর মানুষ। জনসমুদ্রের মাঝ থেকে উঠে উদ্বোধনী ভাষণ দেন বাবরী মসজিদ আন্দোলনের অবিসংবাদিত সিপাহসালার শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.।

তার হৃদয়বিদারক ভাষণ শুনে বাবরী মসজিদ ভাঙার ব্যথায় কেঁদেই ফেলেন অনেকে। দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এ লংমার্চ পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে মানবতার মহাযাত্রা। আমাদের এ লংমার্চ হবে অহিংস। সংখ্যালঘুদের অহেতুক ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কেননা তাদের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন নয়। শাইখুল হাদীস তার ভাষণে জনগণকে গুজবে কান না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরা রাজপথে নেমেছি দাবী আদায় না করে ঘরে ফিরছি না।তিনি কর্মীদের শুধুমাত্র জিকিরের স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাবার আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথি হিসেবে লংমার্চনেতার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যের পর দেশবরেণ্য আলেমদের নেতৃত্বে মহামুক্তির মিছিল শুরু হয়। জনতা সাগরে
তখন জেগেছে উর্মি, নেমেছে লাখো মানুষের ঢল। তরঙ্গের পেছনে তরঙ্গ যেমন ধেয়ে আসে, ঠিক সেভাবে আসতে থাকে মিছিলের পর মিছিল। ঢাকার মানুষ এমন
মিছিল আর কখনো দেখেনি। পথে রাজবাড়ি, মাগুরা, ঝিনাইদাহসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পথসভা হয়।

পথসভাগুলোতে বক্তব্য রাখেন লংমার্চের আহ্বায়ক শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক। প্রতিটি এলাকা থেকেই প্রচুর সংখ্যক নেতা-কর্মী নতুন করে যোগ দিতে থাকেন। পরদিন ৪ঠা জানুয়ারি সকাল ১০টায় যশোর বাস টার্মিনালে যখন সমাবেশ শুরু হয়, তখনযশোরের মাটিতে জনসমদ্রের উত্তাল তরঙ্গ। এত বিশাল সমাবেশ যশোরবাসী দ্বিতীয়টি দেখেনি। ঈদের জামাতে যেমন প্রতিটি মানুষ ঘর থেকে বের হয়, তেমনি চারদিক থেকে লাইন ধরে মানুষ আসতে থাকে। যারা সেদিন সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিল তাদের বক্তব্য হচ্ছে, পুরো যশোরজুড়ে ছিল মানুষ আর মানুষ। যেন তিল ধারণেরও ঠাঁই নেই। মনে হচ্ছিল, গোটা যশোর জেলা পল্টন ময়দানের মত কোনো সমাবেশস্থল। সমাবেশ শেষ করে কাফেলা যাত্রা শুরু করে অযোধ্যা অভিমুখে। মিছিল নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্য সহকারে মুরুলি মোড় ঘুরে বেনাপোল সড়কের দিকে এগোতে থাকে। বেলা ১টা ১০মিনিটে চাঁচড়া মোড়ে কাফেলা বাধার সম্মুখিন হয়। এ সময়ে পুলিশকে গাছের গুড়ি
দিয়ে রাস্তায় ব্যরিকেড সৃষ্টি করতে দেখা যায়। কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

=========প্রলয়ঙ্করি তুফানের মতো কাফেলা সবকিছু তছনছ করে এগিয়ে যায়। কিছু দূরে ফুলেরহাটে পুলিশ আরেকটি ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এতে কোনোই কাজ হয় না। ১টা ১০ মিনিট মূল কাফেলা আসার আগেই মিছিলের অগ্রবর্তী দল তা উপড়ে ফেলে। আরও সামনে এগিয়ে যায় কাফেলা। লাখো জনতার এই স্রোত বানের মত ছুটতে থাকে অযোধ্যামুখে। ভয় নেই। শঙ্কা নেই।
জানের প্রতি মায়া নেই। মুখে আছে জিকির। বুকে দৃঢ় শপথ আল্লাহর ঘর পুনর্নিমাণের। মসজিদ ভাঙার বেদনায় যেন সবাই বেকারার অস্থির।

কাফেলার অগ্রযাত্রা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এর আগেও অনেক ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল কোনো কাজ হয়নি। কাফেলা শুধু সামনে
এগোতে থাকে। সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ধোপাখোলা থেকে মিছিল আর সামনে এগোতে দেওয়া হবে না। সেখানে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অত্যন্ত মজবুত তিন স্তরের ব্যারিকেড দেওয়া হয়। বাংকার খনন করা হয়। যেন অসম শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি। মিছিল যশোরের ধোপাখোলা মাঠে পৌঁছে জোহরের নামাজ আদায় করে।

নামাজ শেষ করার সাথে সাথেই শুরু হয় পুলিশ ও বিডিআরের সম্মিলিত আক্রমণ। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে চার দিকে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় আঁধারে ঢেকে যায় সবকিছু। সংঘর্ষে অনেকেই আহত হয়। সেখানেই মিছিল
কার্যত বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সেই ব্যরিকেড ভাঙ্গা অধিকাংশের পক্ষেই আর সম্ভবপর হয়নি। অনেকেই মনে করতে থাকে মিছিল এখানেই সমাপ্ত। অধিকাংশ মানুষ সেখান থেকেই ফিরে আসে। কিন্তু অসিম সাহসী অপ্রতিরোধ্য একটি কাফেলা নিয়ে বাধার সব প্রাচীর
ভেঙে বীর বিক্রমে এগিয়ে যায় শাইখুল হাদীস।

তখন লংমার্চের সিপাহসালার শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে। পুলিশ মনে করেছিল শাইখুল হাদীস
আলাদা শান-শওকত নিয়ে আসবে, পুলিশের খুঁজে বের করতে কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু শাইখুল হাদীস সাধারণ জনতার সাথে পায়ে হেঁটে কখন ব্যরিকেড পার
হয়ে গেছে তা কেউ টেরই পায়নি। আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলে বীর বিক্রমে মিছিল এগিয়ে যায়। ঈমানের দৃঢ়তা মুমিনকে কতটা ভয়হীন, শঙ্কাহীন, শক্তিশালী করে
দেয়, তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই সে দিনের মিছিলকারীদের দেখে। বাধা আসছে, ব্যরিকেড দেওয়া হচ্ছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না জনতাকে। যেন
বাধভাঙা স্রোত।

লাউজানির রেলগেটের আগে আরেক বাধা অতিক্রম করে কাফেলা। সেখানেই আসরের নামাজ আদায় করা হয়। এভাবে ১২ কিলোমিটার পথ চলতে চলতে মিছিল
যশোরের ঝিকরগাছা ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে। সেখানে দেখা যায় ব্রিজের মধ্যে পুলিশের লম্বা লম্বা লরি এলোপাতাড়ি রেখে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে। নদী পার হওয়ার কোনো পথখোলা নেই।

_______________নামাজের পরপরই কাফেলার একটা অংশ ঝিকরগাছা ব্রিজের ব্যাড়িকেড ভেঙেহাজের আলি বালুর মাঠে পৌঁছলে মিছিল পুলিশের দ্বারা আবার প্রচণ্ডবাধাগ্রস্থ হয়। শুরু হয় বেপরোয়া লাঠিচার্জ আর কাদানে গ্যাস নিক্ষেপ। কিছু যুবক এর প্রতিবাদ জানাতে থাকে।

তখনই ঘটে যায় হৃদয় বিদারক ঘটনা। গোটাপৃথিবীকে হতবাক করে নিরস্ত্র এই মিছিলে বিএনপি সরকারের লেলিয়া দেয়া পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরুকরে। ঝাঁঝরা হয়ে যায় হারুন, কামরুলসহঅসংখ্য যুবকের বুক।

গুলি বর্ষণের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কামরুল পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলছিল -ওরেঘাতকরা, তোমরা কি মুসলমান নও?
কালেমায় বিশ্বাসী নও? আমাদেরকে সামনে এগোতে দাও। পুলিশ এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে সরাসরি
কামরুলের বুকে গুলি করে।আল্লাহর জমিনে আল্লাহর ঘর রক্ষার এই সংগ্রামে বুলেটের সামনে বুক পেতে
দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি শহীদকামরুল আর হারুন সহ ৬ শহীদ । আল্লাহর রাহে প্রবহমান সে রক্তে ভিজে লংমার্চ লাভ করে শহিদি কাফেলার মর্যাদা।

সেই কাফেলা আজ ইতিহাস। শাহাদতের তামান্নায় প্রস্তুত হও আগামিকাল,
হে বাংলার বীর মর্দে মুজাহিদ...।
সফল কর, কবুল কর, হে রাব্বিল আলামিন...