বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

চরমোনাই মাহফিল: একটি দ্বীনি পাঠশালা

মাওলানা মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা তালুকদার: দ্বীনের পরিপূর্ণ ধারনা পেতে হলে আধ্যাত্মিক নেতার নিকট যেতে হবে”- এ বিষয়ে নানা কথা-বার্তা প্রচলিত থাকলেও শুধুমাত্র কুরআন-হাদিস ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন করে গোটা দ্বীনকে জানা ও অনুসরণ করার পথটা মসৃণ হয় না। এ বিতর্কের অবসানেই তো মায্হাবের উৎপত্তি হয়েছে। মায্হাব উপেক্ষা করা মানে দ্বীনের ধারনা থেকে অসম্পূর্ণ থাকা। মাযহাব না মানা এখন একটা ফ্যাশন হয়ে দাড়িয়েছে।

পাক-ভারত উপমহাদেশ ওলী-আল্লাহ্, পীর-বুযুর্গতে ভরপুর। ধর্ম প্রচারকদের পদচারণা এ অঞ্চলে অধিক থাকায় ধার্মিক (প্রাকটিসিং) মুসলমানদের সংখ্যাও বেশি। বাগদাদ, ইয়েমেন তথা আরব থেকে ধর্ম প্রচারকগণ প্রাচ্যে ইসলামকে ছড়িয়ে দিতে নিরবচ্ছিনভাবে সফর করতেন। সেটা সাহাবী-তাবেয়ীদের সময়কাল থেকেই। বঙ্গদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সফরকারী ওলী-আল্লাহদের মাধ্যমেই। যার প্রমাণ এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে আলোচিত ‘ত্বরীকা’ হিসেবে প্রায় সর্বজনের নিকট জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্যতায় এগিয়ে রয়েছে ‘চরমোনাই ত্বরীকা’। এটির মূলে রয়েছে চিশতিয়া সাবেরিয়া ত্বরীকার আকাবীরগণ। জনশ্রুতি রয়েছে, চরমোনাই দরবারের দাদাপীর সৈয়দ মুহাম্মাদ এছহাক রহ. এর পূর্ব পুরুষ আরব অঞ্চল থেকে বাঘের পিঠে সাওয়ার হয়ে বরিশাল অঞ্চলে দ্বীন প্রচারে এসেছিলেন। দাদাপীর রহ.এরপূর্ব পুরষগণ বর্তমান চরমোনাই ইউনিয়নের পশুরীকাঠিতে বসতি স্থাপন করেন। সেখান থেকে দাদাপীর রহ. চরমোনাইতে (শ্বশুরবাড়ি এলাকায়) এসে দ্বীনের আঞ্জামে লিপ্ত হন। প্রতিষ্ঠা করেন আহসানাবাদ রশিদিয়া আলিয়া মাদ্রাসা। তিনি কুমিল্লার উজানীর ক্বারীইব্রাহীম রহ. থেকে খেলাফত প্রাপ্ত হয়ে পথভোলা বান্দাদেরকে মারেফাতের দীক্ষা প্রদান শুরু করেন।

আমার শৈশব কেটেছে চরমোনাইতে, নানাবাড়ি দরবারের সন্নিকটে হওয়ায় মাহফিল দর্শন সেসময় থেকেই। মাহফিল দেখার আকর্ষণে চরমোনাই ছিল স্বপ্নের জায়গা। দাদাপীর রহ. এর মুরীদ, আমার বাবার সাথে গিয়ে তাঁর সাক্ষাত করেছি বটে,এখন অবশ্য তাঁর চেহারাবয়ব মনে নেই। তবে সেকালের মাহফিলের আকার-প্রকার এখনও চোখে ভাসে। কয়েক ডজন হ্যাজাক লাইট মাহফিল চত্বর আলোকিত করত। প্রতি মাহফিলে মাইকের (হর্ণ) সংখ্যা কয়টা বৃদ্ধি পেল তা গুনে দেখতাম। প্রথম গণনায় এক ডজনের বেশি মাইকের কথা এখনও মনে আছে। হ্যাজাকের পরিবর্তে আনা হলো ডায়নামোর মাধ্যমে টিউবলাইট জ্বালানো। অন্তত: ৪০/৪২বছর পূর্বে সে সময়ে মাইক (হর্ণ) ও টিউবলাইট গণনা করাই ছিলো আমার মাহফিল কেন্দ্রিক শিশুতোষ আগ্রহ। দরবারের প্রচারবিমুখতা নীতির কারণে চলতি আয়োজনের তথ্যাদি উল্লেখকরা হলো না, সেক্ষেত্রে দর্শক হিসেবে আপনি সঠিক একটি আন্দাজ পেতে পারবেন।

চরমোনাই মাহফিলের প্রসারতা বৃদ্ধি পায় মূলত: মরহুম পীর সাহেব সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করিম রহ.-এর জীবদ্দশায়। তাঁর ওয়াজের মোহনীয়তায় তন্ময় হয়ে থাকত পথহারা বান্দারা। তাঁর কণ্ঠের সুরেলা ধ্বণি ছিলো মহান আল্লাহর প্রদত্ত বিশেষ নিয়ামত। তাঁর বয়ানের সময় হাউমাউ করে ক্রন্দন করত হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা। মাত্র একবার তাঁর বয়ান শুনে অনেকেই হেদায়েতের দিশা পেয়েছেন। কুরআন-হাদিসের আয়াত ও উদ্ধৃতি যখন তিনি নিজস্ব ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করতেন তখনকার পরিবেশ হয়ে উঠত স্বর্গীয় আলোকচ্ছটায় বর্ণিল। স্বয়ং আল্লাহর বিশেষ অনুকম্পা ছাড়া এমন বয়ান কারও দ্বারা সম্ভব হতে পারে না। আল্লাহ্ভোলা মানুষকে স্বীয় মাওলার সাথে সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রে তাঁর ওয়াজের ধরনটা ছিল চিত্তাকর্ষক। যা পবিত্র কুরআনের নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহান আল্লাহর বাণী- “তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে বিতর্ক করবে উত্তম পন্থায়” (সূরা-নাহল, আয়াত-১২৫)। এ আয়াতের অন্তর্নিহিত ভাবধারার সাথে হুবহু মিল রেখেই মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম আজীবন পরিচালনা করে গেছেন। প্রতিটি বয়ানে তাঁর সহজ-সরল আকুতি ছিল- বাবারা! তোমাদের হাত-পা ধরেও বলছি, কুরআনের কথা সত্য মনে তা বিশ্বাস কর। কবরের আযাব ও জাহান্নামের আগুনকে ভয় কর। অতএব, প্রস্তুত হয়ে কবরে যাও। যদি সত্য হয়ে থাকে তোমরা বেঁচে গেলে, আর মিথ্যা হলেও তো ক্ষতি নেই! তুমিও বেঁচে গেলে, আমিও বেঁচে গেলাম।

মরহুম পীর সাহেব রহ. ছিলেন তাঁর সময়কালের সেরা মেধাবীও চৌকস ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বহুমাত্রিক দক্ষতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের শিরোমণি হয়ে আজও তিনি বেঁচে আছেন লাখো মুমিনের হৃদয়ে। ‘সৈয়দ’ বংশের কৃষ্ণকায় মানুষটির মাঝে মাওলার নূর যেন অবারিত ছিলো। স্বীয় পিতার থেকে খিলাফত লাভের পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন সে সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও মুফাসসির। আবার ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল। একজন আলেম হিসেবে ব্যবসা করে সফলতা লাভ করার নজির গড়ে ছিলেন তিনি। সে সময়ে নিজ এলাকায় তিনি অন্যতম ধনী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। চরমোনাই পীরের সমালোচকরা এ তথ্যটি আমলে নিবেন আশাকরি।

একজন ডায়নামিক আধ্যাত্মিক নেতার বদৌলতে আজ চরমোনাই দরবার সমহিমায় দাড়িয়ে আছে। তিনি কিতাবী ও আমলী আলেম তৈরির উদ্দেশ্যে চরমোনাইতে আলিয়ার পাশাপাশি কওমিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করেছেন। হালে আলিয়া ও কওমিয়া শাখার ব্যাপকতা ঈর্ষনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর অধ্যয়ন শেষে এখান থেকে শতশত মাওলানা, মুফতি ও হাফেজ ফারেগ হয়েই ইসলামের খেদমতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করছেন। তিনি অশিক্ষিত ও সাধারণ শিক্ষিতদের মাঝে কুরআনের আলো পৌঁছেদিতে বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড স্থাপন করেছেন। দেশের সকল গ্রামে একটি করে কুরআনের মাদ্রাসা স্থাপনই যার মূল লক্ষ্য। ছহীহ্ভাবে ক্বিরাত না পড়লে নামাযই তো হয়না, সেক্ষেত্রে নামাজ বা ইবাদাত কবুল করাতে হলে কুরআনকে ছহীহ্শুদ্ধভাবে শেখার বিকল্প নেই। ঠিক এ উদ্দেশ্যেই তিনি সর্বজনীন কুরআন শিক্ষার উপর জোর দেন। তাঁর মৌলিক দায়িত্ব ছিলো-আল্লাহ্ভোলা মানুষকে সচেতন করতে দেশের সকল প্রান্তে ছুটে গিয়ে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে কলেমাগো মুসলমানদেরকে জাগিয়ে তোলা।

চরমোনাই ত্বরীকার প্রাথমিক ছবক ‘আওয়াজের সাথে যিকির করা’ এদেশের মুসলামনদের মাঝে ভালোভাবেই ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বিষয়টা এমন-আওয়াজ করে যারাই যিকির করেন তারাই যেন চরমোনাই মুরীদ। বাংলাদেশের এমন কোন মাসজিদ আছে কী? যার মুক্তাদি কেউ না কেউ চরমোনাইয়ের মুরীদ নন! এটাই চরমোনাই ত্বরীকার সফলতা এবং মাওলা পাকের কবুলিয়তের লক্ষণ। আর এ সফলতার কাহানী ছড়িয়ে পড়েছে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে মদীনাওয়ালার বাড়িতে। আল্লাহর শোকর প্রতি মাহফিলেই স্বচক্ষে অবলোকন, ফয়েজ ও বরকতের জন্য দারুল উলুম দেওবন্দ ও মক্কা-মদীনা থেকে সম্মানিত মেহমানগণ ছুটে আসেন চরমোনাইয়ের ময়দানে।

দ্বীনি ইলম শিক্ষা ও দাওয়াতি কার্যক্রমে মরহুম পীর সাহেব সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম রহ. ছিলেন দক্ষিণ বাংলার সফল আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। নিজে সুন্নাতের হুবহু পাবন্দি ছিলেন এবংতাঁর বয়ানের মাধ্যমে সবাইকে ফরজ ওয়াজিবের পাশাপাশি সুন্নাত অনুসরণ ও পালনের দাওয়াত দিতেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোষহীন। ঠিক এ কারণেই তাঁর অনুসারীদের দেখলেই সহজেই চিহ্নিত করা যায় যে এরা চরমোনাই মুরীদ। সুন্নাতকে যারা উপেক্ষা করবে তাদেরকে তিনি পূর্ব ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন যে- “তারা আমার মুরীদ না। তারা আমার মুরীদ না। তারা আমার মুরীদ না।”

বর্তমানে ১০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে চরমোনাই ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম-এর নেপথ্য নায়ক ছিলেন তিনি। তবে তবে তাঁর মৃত্যুর পরে খিলাফত প্রাপ্ত দু’ ছেলে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ও মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বাবার উপযুক্ত সন্তানের মর্যাদা ধরে রেখেছেন। আমিরুল মুজাহিদীন হিসেবে পীর সাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পিতার যেন হুবহু ছায়াচিত্র। তিনি পিতার ন্যায় বয়ানের মাধ্যমে এক মোহনীয় মূর্ছণা তৈরি করে যাচ্ছেন। তাঁর বয়ানের গভীরতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা (তা’ছীর) অবিকল বাবার মতোই। নায়েবে আমীরুল মুজাহিদীন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফায়জুল করিম পিতার অন্যতম যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে অনুসারী, জনসাধারণ এমনকি আলেম মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলছেন। তাঁর দেমাগে কত সংখ্যক ও কত বড়বড় হাদিস মওজুদ আছে সে ব্যাপারে গবেষণা হতে পারে। পিতার বয়ানের সৌন্দর্য্য ও নূর উভয়ের কণ্ঠ থেকে লক্ষ লক্ষ অনুসারীদের উদ্দেশ্যে যখন বের হয় তখন উপস্থিত দর্শক শ্রোতা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের মাঝে এক আবেগঘন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফলে তাঁরা মাওলার সাথে সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যম হিসেবে চরমোনাই ত্বরীকাকে বেছে নেয়। তাঁদের বয়ানে যে মাধুর্য ও নূরাণী জৌলুস থাকে তা মাওলা পাকের বিশেষ অনুগ্রহ ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

 

লেখক : কা‌মিল (ডবল), এম.এ (ঢ‌া.‌বি)

ইসলামী গ‌বেষক ও কলামিস্ট