বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

তিনশো আসনে প্রার্থী দিবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে : ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে দলটি। প্রতিষ্ঠাকালে নাম ছিলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ২০০৮ সালে দলটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে নিবন্ধিত হয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর ছিলেন মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এবং প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন ব্যরিস্টার কুরবান আলী। পরবর্তীতে ব্যরিস্টার কুরবান আলী দলচ্যূত হলেও আজীবন দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ফজলুল করীম রহ.। তার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।

১৯৯১ সালে ইসলামী ঐক্যজোটের অংশিদার হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে চারদলীয় জোটে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ইসলামি ঐক্যজোট ত্যাগ তারা। ইসলামী জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নামে নির্বাচনী জোট করে এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে। নির্বাচনে ঐক্যফ ফ্রন্ট ১৪টি আসন লাভ করলেও ইসলামী আন্দোলনের কোনো আসন ছিলো না।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে। এবারও তারা কোনো আসন লাভ করে নি। তবে মোট ভোটের ০.৯৪ ভাগ লাভ করে। যা দলীয় ভোটের বিবেচনায় ৫ম এবং জামাতে ইসলামী ব্যতীত অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর মধ্যে শীর্ষ। ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে বিরত থাকে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ।

অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর অবস্থান দিনদিন দুর্বল হওয়ায় ইসলামি রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলন এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। এ অবস্থান কাজে লাগিয়েই আগামী নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য প্রত্যাশা করছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। নব গঠিত ইসি, আগামী জাতীয় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের আশা-প্রত্যাশা, প্রস্তুতি ও ইশতেহার নানা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি। আলাপচারিতার চুম্বকাংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন আতাউর রহমান খসরু।

ইসি গঠনে ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যাশা পূরণ হয় নি। দলটি মনে করে, তাদের প্রস্তাবনা বিবেচনা করলে আজ ইসিকে নিয়ে সচেতন মহলে বিতর্ক হচ্ছে তা হতো না। তবে দলের যুগ্ম মহাসচিব মনে করেন, ‘বর্তমান ইসিকে মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় এখনো পার হয় নি। ইসিকে মূল্যায়ন করতে হলে আরও কিছু সময় প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তাছাড়া ইসি নিরপেক্ষ হলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ তা কিন্তু নয়। এর সাথে আরও অনেক কিছু জড়িত। যেমন, নির্বাচনকালীন সময়ে কারা সরকার পরিচালনা করবে, সে সরকারের আচরণ কেমন হবে, প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসি যদি নিরপেক্ষও হয় আর প্রশাসন ও সরকার যদি সহযোগিতা না করে তাহলে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব প্রশাসন ও সরকারেরও।’

নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দলটি আরও কিছু সময় নিবে। নতুন ইসি ও সরকারের কাযক্রম পযবেক্ষণ করছে দলটি। পরিবেশ পরিস্থিতি ইতিবাচক মনে হলে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিবে তারা। তবে আপাতত ইতিবাচক ভাবনায় কাজ করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে। এ ব্যাপারে গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনমুখী একটি দল। সাধারণত আমরা সব ধরণের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি দলে রয়েছে।’

কেমন প্রস্তুতি রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী তৎপরতা আমাদের দলে সারা বছরই চলে। তাই নতুন করে খুব বেশি কিছু আমাদের করা লাগবে না।’

কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব নিশ্চয় অন্য কোনো নির্বাচন থেকে ভিন্ন? ‘আসলে আমরা তো প্রার্থী কেনাবেচা করি না। আমাদের প্রার্থীও প্রস্তুত থাকে। অন্যান্য প্রস্তুতিও থাকে।’

তবে কী গত জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীরাই এবার নির্বাচন করবেন? ‘না, না। আমাদের তৃণমূল থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রস্তাব আসে। তারপর আমাদের নির্বাচনী সেল যাকে উপযুক্ত মনে করেন তাকে মনোনয়ন দেন। এবং সে প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।’

নির্বাচনী জোটের ব্যাপারে বেশ সতর্ক দলটি। আপাতত নির্বাচনী কোনো জোটের ইচ্ছে নেই। বিভিন্ন দল নির্বাচনী জোটের ঘোষণা দিলেও সে ব্যাপারে আগ্রহবোধ করছে না ইসলামী আন্দোলন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, যারা জোটের রাজনীতিতে অভ্যস্ত তারা এখনি জোটের জন্য ব্যস্ত হয়ে গেছেন। আমরা শুধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমরা আদর্শের রাজনীতি করি। কেউ যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সহযোগী হতে চাই তাহলে তার সাথে আমরা জোটভূক্ত হবো অথবা যুক্ত করবো। ক্ষমতার অংশিদার হওয়ার জন্য আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জোট করবে না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

কিন্তু বার বার নির্বাচন করেও উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য না থাকলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় না? ‘আমাদের কর্মীদের মধ্যে কোনো হতাশা নেই। আমাদের কোনো পর্যায়ে কোনো হতাশা নেই। আমরা রাজনীতি করি ইবাদত হিসেবে। সারা জীবন নামাজ আদায় করে কেউ যদি দুনিয়া কিছু না পায় তাহলে যেমন সে হতাশ হয় না। তেমন আমাদের কোনো হতাশা নেই।’

এ ক্ষেত্রে মানুষের সমালোচনাকেও গুরুত্ব দিতে নারাজ এ নেতা। তিনি মনে করেন, ‘মানুষ রাজনীতিকে বৈষয়িক বিষয় মনে করে বলেই নির্বাচনের জয় পরাজয়কে সবকিছু মনে করে।’

তবে সব মুরিদ দলকে ভোট দেয় না বিষয়টি স্বীকার করে দলের যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘মরহুম চরমোনাই পীর সাহেব বলতেন এবং বর্তমান পীর সাহেবও বলেন যারা ভোট দেয় না, তারা মুরিদ দাবী করলেও প্রকৃত মুরিদ তারা নয়। প্রকৃত মুরিদ সবাই দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেয়।’

এবারও দলটি তিনশো আসনে প্রার্থী দিবে এবং তিনশো আসনেই জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচন করবে। দলের সব প্রার্থী ও সব আসনকে সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করে দলটি। তাই দলের কাছে বিশেষ টার্গেটের কোনো আসন নেই। তবুও সম্ভাবনাময় আসনগুলো নিয়ে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দল বিশেষ উদ্যোগী হতে পারে।

পুরাতন কৌশলেই নতুন করে এগুতে চায় ইসলামী আন্দোলন। দলের যুগ্ম মহাসচিবের দাবি তারা আদর্শের রাজনীতি করে বলে তাদের নির্বাচনী কৌশল বারবার পরিবর্তন হয় না। ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী কৌশল ইসলাম। আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এ জনগণের মাঝে প্রচার করছি। এটাই আমাদের নির্বাচনী কৌশল। আমাদের কৌশলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। 

নির্বাচনী ইশতেহারেও ব্যাপক কোনো পরিবর্তন আসবে না। গত নির্বাচন এবং তার পূর্বে যে ইশতেহার ছিলো মৌলিকভাবে তাই থাকবে। সাথে সমসাময়িক কিছু বিষয়ের সংযোজন হবে। সামান্য কিছু সংস্কার হবে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। তারপরও ইসলামী দলগুলো নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারছে না কেনো? উত্তরে গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না থাকার কারণ হলো বাংলাদেশের মানুষ ধর্মের ব্যাপারে আবেগী হলেও তাদের সামনের ধর্মের সঠিক উপস্থাপন হচ্ছে না। তারা মনে করে, ধর্মে রাজনীতি নেই, রাষ্ট্র নেই। ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো রাষ্ট্র নিরপেক্ষ। আমরা যারা ইসলামের দাওয়াত দেই তারা খণ্ডিত ইসলামের দাওয়াত দেই। বরং কেউ কেউ যারা পূর্ণাঙ্গ ইসলামের কথা বলে অর্থাৎ গণবিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের সমালোচনা করি।

এছাড়াও আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা জনমত তৈরিতে সহযোগিতা করছে না। বরং কোনো ক্ষেত্রে বিরোধিতা করছে।

তিনি মনে করেন, ইসলামি দলগুলোর ঐক্যের চিন্তা ভালো তবে সব ইসলামি দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাবী অবাস্তব। তার মতে, সব ইসলামি দল ঐক্য হতে পারে না। কারণ, বিভিন্ন মতাদর্শ ও বিভিন্ন শক্তির এজেন্টা বাস্তবায়নের জন্যও ইসলামের নামে অনেক দল হয়েছে। তাদের সাথে জোট করা সম্ভব কীভাবে?

তারপরও সব মিলিয়ে আগামী দিনে ইসলামি দলগুলোর ভালো অবস্থান তৈরি হবে এবং তারা নির্বাচনে ভালো ফলাফল করবে এমনই প্রত্যাশা মাওলানা গাজী আতাউর রহমানের।

কৃতজ্ঞতা: আওয়ার ইসলাম