শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

ইসিতে জোড়ালো হচ্ছে আলেমের দাবি

আতাউর রহমান খসরু :

নতুন নির্বাচন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটির নাম প্রস্তাব করেছে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণপ্রাপ্ত ২৭ রাজনৈতিক দল। নাম জমা পড়েছে ১২৫টি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রস্তাবিত হয়েছে ৩ আলেমের নাম। তারা হলেন, আল্লামা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আযহার আলী আনোয়ার শাহ ও ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন। তাদের নাম প্রস্তাব করেছে যথাক্রমে খেলাফত মজলিস, ইসলামি ঐক্যজোট ও খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আলেমের নাম প্রস্তাব রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে সর্বশ্রেণির মানুষের মনে। ইসলামি ধারার রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছে আলেমের নাম প্রস্তাব করায় জনগণেরই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। আলেমগণ জনগণের অভিভাবক ও আস্থার প্রতীক।

ইসলামি দলগুলোর প্রত্যাশা সার্চ কমিটি অবশ্যই আলেমদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। আলেমদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পূরণ করবেন জনগণের প্রত্যাশা। সাধারণ ভোটারগণও বলেছে তাদের প্রত্যাশা ও সংশয়ের কথা।

আল্লামা আনোয়ার শাহ সৎ ও সাহসী ব্যক্তি: মুফতি ফয়জুল্লাহ

সার্চ কমিটির কাছে আলেমের নাম প্রস্তাব করেছে ইসলামী ঐক্যজোট। তারা প্রস্তাব করেছে কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ার পরিচালক ও শহিদি মসজিদের খতিব আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ-এর নাম। তারা কেনো আলেমের নাম প্রস্তাব করলেন তা ব্যাখ্যা করেছেন দলটির মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রতিশ্রুতিশীল বাংলাদেশ গড়ার জন্য সকল ক্ষেত্রে আলেম তথা দীনি জ্ঞানসম্পন্ন এবং সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত উভয় শ্রেণির সমন্বয় সাধন করা আবশ্যক। নতুবা সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।

নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন একটি স্পর্ষকাতর জায়গা। এখানে সর্বোচ্চা নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া আবশ্যক। আমরা মনে করি, একজন আলেমই তার দিতে পারেন। যিনি আল্লাহকে ভয় পান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে যিনি সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার দিবেন। এমন আলেম থাকলে ইসি জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে।

আলেম না থাকলে ইসি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলেই আমি মনে করি। অনেক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থতার পরিচয়ও দিতে পারে।

আপনাদের প্রস্তাবিত ব্যক্তির সে যোগ্যতা ও সামর্থ্য আছে কী? উত্তরে মুফতি ফয়যুল্লাহ বলেন, আমরা তাকে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি মনে করি। করণীয় কাজে তিনি সাহসীও বটে। তিনি অবশ্যই এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম বলে আমরা মনে করি। তিনি শুধু দেশে নয়; আন্তর্জাতিক পযায়ে একজন গ্রহণযোগ্য আলেমে দীন ব্যক্তিত্ব।

প্রস্তাবের ব্যাপারে মাওলানা আনওয়ার শাহ-এর সম্মতি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন এবং আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি।

প্রস্তাব বিবেচিত হওয়ার ব্যাপারে কতোটা আশাবাদী প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী মানুষ। হতাশ হতে আল্লাহ আমাদের নিষেধ করেছেন। সরকার বলছে, তারা নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমুলক নির্বাচন উপহার দিতে চায়। সার্চ কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তাদের দাবি সত্য হলে, তারা অবশ্যই আমাদের প্রস্তাব বিবেচনা করবে। আর ইসিতে আলেম রাখা হবে বলেও আমি আশা ব্যক্ত করছি।

আল্লামা মাহমুদুল হাসান জাতির প্রয়োজন উপেক্ষা করবেন না: অধ্যাপক আবদুল জলিল

সার্চ কমিটির কাছে একজন আলেমের নাম প্রস্তাব করেছে খেলাফত মজলিসও। দলটির পক্ষ থেকে আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্চ কমিটি গঠনের আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট সার্চ কমিটিতে একজন আলেম রাখার প্রস্তাব করেছিলো তারা। কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একজন চান কেনো তারা এমন প্রশ্নের উত্তরে দলটির প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল জলিল আওয়ার ইসলামকে বলেন, আলেমেগণ দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থাশীল। বিশ্বস্ততার ব্যাপারে আলেমগণ অনেক এগিয়ে। সুতরাং আলেমগণ ইসিতে থাকলে ইসির গ্রহণযোগ্য বৃদ্ধি পাবে। আলেমগণ এ দায়িত্ব পালনে সক্ষমও।

তিনি আরও বলেন, আলেম না থাকলে নতুন ইসি সর্ব শ্রেণির নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।

আল্লামা মাহমুদুল হাসানকে বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে অধ্যাপক আবদুল জলিল বলেন, আমাদের জানা মতে তিনি একজন নিরপেক্ষ, সৎ ও যোগ্য মানুষ। আলেম হিসেবেও তিনি সর্বশ্রেণির নিকট গ্রহণযোগ্য। তার যোগ্য ও গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে কোনো আপত্তি আছে বলে আমরা মনে করি না। আল্লামা মাহমুদুল হাসান বিষয়টি কীভাবে দেখছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমার জানা মতে দলীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা হয় নি। তবে আমাদের বিশ্বাস জাতির প্রয়োজন অবশ্যই উপেক্ষা করবেন না।

সার্চ কমিটিতে একজন আলেম রাখার প্রস্তাব করেছিলেন তারা। সে প্রস্তাব বিবেচনা করা হয় নি। তবুও তিনি আশাবাদী সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন উপহার দিতে এবার তাদের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। আর তাতে আলেমের অংশগ্রহণ থাকবে অবশ্যই।

ইসিতে আলেম যুক্ত হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে: মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী

সার্চ কমিটির কাছে শিক্ষাবিদ ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের নাম জমা দিয়েছে খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ। এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে দলটির ঢাকা মহনগর আমীর মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী বলেন, একজন আলেমের ভেতর খোদাভিতি ও তাকওয়ার পূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকে। তিনি যদি কোনো দায়িত্ব পালন করেন তবে পরকালে জবাবদিহিতার কথা চিন্তা করেই দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে ইসিতে আলেম থাকলে কাজে স্বচ্ছতা আসবে। জবাবদিহিতা থাকবে।

প্রস্তাবিত ব্যক্তি কতটুকু যোগ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা জানি ধর্মীয় ও সাধারণ উভয় শিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি দেশে একজন বুদ্ধিজীবি হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি এবং সর্বমহলে তার গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। এ কারণে আমাদের মনে হয়েছে ইসিতে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনকে রাখা হলে তিনি দক্ষতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করবেন।

আলেমদের অংশগ্রহণকে আমরা স্বাগত জানাবো: মাওলানা গাজী আতাউর রহমান

সার্চ কমিটির কাছে নাম জমা দেয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের দাবি রাষ্ট্রপতি ও সার্চ কমিটি আন্তরিক হলে নাম দেয়ার প্রয়োজন নেই। আর তারা আন্তরিক না হলে নাম দেয়া অর্থহীন। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে যে নামগুলো প্রস্তাব করা হবে সেগুলোই বিতর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দলের পক্ষে আওয়ার ইসলামকে এমনি বলেছেন, দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।

তবে তিনিও স্বাগত জানিয়েছে আলেমের নাম প্রস্তাবকে। তিনি বলেন, যারা আলেমের নাম প্রস্তাব করেছেন তারা ভালোই করেছেন।

তিনিও আরও বলেন, আমরাও চাই দেশের সর্ব ক্ষেত্রে আলেম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক। নির্বাচন কমিশনও তার বাইরে নয়; তবে বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এ ক্ষেত্রে আশাবাদী হওয়ার খুব বেশি সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশনে আলেমকে অন্তর্ভূক্ত করা হলে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাবো।

সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

সাধারণ ভোটার ভেতরও বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তারা খোলামেলাভাবেই জানিয়েছে তাদের প্রত্যাশা ও সংশয়ের কথা।

মুগদা-বাসাবো ও পুরাণ ঢাকার কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক জানতে পেরেছে যে, সাধারণ ভোটাদের বৃহদাংশই আলেমদের অংশগ্রহণকে সমর্থন করেন। তাদের মতে আলেমগণ আল্লাহর পথের মানুষ। তারা অবশ্যই নির্বাচনের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করবেন না। যেমন, জনাব আলামীন শেখ। তিনি মুগদা এলাকার ভোটার। অত্র এলাকায় আছেন প্রায় পনের বছর। আলেমদের অংশ গ্রহণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আলেমদের আমরা শ্রদ্ধা করি। তারা সত্য কথা বলে। ভালো কাজ করে। নির্বাচন কমিশনে তারা থাকলে ভালোভাবে কাজ করবেন।

তবে তাদের দায়িত্বপালনের সামর্থ্য নিয়েও রয়েছে একদল ভোটারদের সংশয় রয়েছে। তারা বলছেন, আলেমগণ হয়তো মানুষ হিসেবে সৎ কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রাশাসনিক যোগ্যতা অভাব রয়েছে। এস এম আবদুস সুবহান। চাকরি করেন একটি সরকারি ব্যাংকে। তিনি বলেন, ‘আলেমগণ অবশ্যই নির্বাচন কমিশনে যেতে পারেন। তবে তাদের অভিজ্ঞতার অভাব আছে বলে আমি মনে করি। যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলে তারাও হয়তো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।’

তবে একদল ভোটার মনে করছেন, শিক্ষা বা অভিজ্ঞতার অভাব নয়; আলেমগণ সেখানে যাবেন না নিজেদেরকে বিতর্কের উর্ধ্বে রাখার জন্য। কেননা তাদের মতে নির্বাচন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। সুতরাং তারা সেখানে গেলে বিতর্কিত হবেন।
সূত্র: আওয়ার ইসলাম