বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

চরমোনাই মাহফিল নিয়ে আমার ভাবনা

১৯৮৮ সাল। ক্লাশ ফাইভে পড়ি। আমার আব্বাজান রহ. সে সময়ে চরমোনাই‘র অগ্রহায়ন অথবা ফাল্গুনের মাহফিলে নিয়ে গেলেন। মাদারীপুর জাফরাবাদ গ্রাম থেকে ট্রলারযোগে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে রাতে চরমোনাইতে নোঙ্গর করি। নামতে নামতে কানে আসে লা ইলাহা ইল্লাহর জিকির। নরম ও করুণ সুরে জিকেরের আওয়াজ এতই সুমধুর লাগছিল, মনে হয় মাওলার নুরের খেলা জমে উঠছে। কিছুক্ষণ পরে এশার নামাজ আদায় হল। খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে গেলাম। রাত গভীর হল........কানে কানে কে যেন ডাকছে, উঠুন বা তাড়াতাড়ি ওঠ......তাহাজ্জুদ পড়। উঠলাম.......কিছুক্ষণ পরেই লম্বা ও মায়াবী সুরে মুয়াজ্জিন আজান দিলেন। আজানে চোখের পানি ধরে রাখা যাচ্ছিল না। শেষ না হতেই মাওলা পাকের জিকির লা.... ইলাহা... ইল্লাহ। কিযে মধুর টান জিকিরে..না শুনলে বুঝানো যাবে না। নামাজ হল, ভোর হল, কেমন যেন হেদায়েতর দোর খুলল। পীর সাহেব চরমোনাই রহ. বয়ান শুরু করলেন। সম্ভবত কওমী মাদরাসার সামনে তৎকালিন জোড়া পুকুরের পাশে বসে বয়ান শুনছি। বয়ানের এক পর্যায়ে উজানীর ফয়েজ চরমোনাইতে নাকি লাগে..যা হবার তাই। ওরে কান্নাকাটি আর পাগলদের লাফালাফি, যা কঠোর হৃদয়ের মানুষকেও মমের মত নরম করে তুলে। এক আল্লাহর পাগল আমার পাশ দিয়ে দৌড় দিয়ে সোজা পুকুরের কাদার ভিতরে পড়ে গেলেন, তার মাথাসহ বুক পর্যন্ত কাদার মধ্যে গেথে রইল। আমার মনে হল লোকটি মারাই যাবে। অনেক্ষণ পর স্বেচ্ছাসেবক ভাইয়েরা এসে তাকে ওঠালেন। দেখি তখনও সে জিকির করছে। আশ্চর্য হলাম, এতক্ষণে কেমন করে কাদার মধ্যে রইলেন। যাক দেখেতে দেখতে তিন দিন চলে গেলেন। আখেরী মোনাজাত হল। চললাম দেশের পানে।

সেই ছোট্ট ময়দান আজ অনেক বড়! অনেক বড়!! যে বড় এর কোন শেষ নেই। যে ময়দানে মাওলার ভয়ে ও মহব্বতে এত বেশী চোখের পানি পড়ে মাঠ ভিজে যায়, যা অন্য কোন দরবারে বা মাঠে ভিজে কিনা আমার জানা নেই। তবে এ দেশে অনেক নামী-দামী বড় বড় দরবার আছে, কিন্তু চরমোনাই‘র মাহফিল বা দরবাবের তুলনা আমার কাছে একটাই..সেটা..............।

চরমোনাই আজ একটা সাইনবোর্ড। শুধু সা্ইনবোর্ড  বললে ভুল হবে, এটা মহা এক সাইনবোর্ড। বাংলার নয় শুধু, সারা বিশ্বে আজ চরমোনাই‘র পরিচিতি। দিন যাচ্ছে আকর্ষণ বাড়ছে। চল দেখি চরমোনাই, দেখি কেমন এক অদ্ভুদ জায়গা। কেন মানুষ ছুটে যায়? কেন তারা মাওলার পাগল হয়? কেন তারা সাহসী যোদ্ধা হয়? সংগ্রামে-রাজপথে তাদের কেন এত বিচরণ? শত বাঁধা আর কাদা ছুড়াছুড়ির মধ্যেও কেন এগিয়ে চলছে? কেনই বা তাদের এত জনবল তৈরী হচ্ছে? কেনই বা যেখানে পীর সাহেব চরমোনাই বা বাংলার বাঘ হযরত মুফতি সাহেব সফরে যান সেখানে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয়? কেনই বা তাদের কথায় এত চুম্বক? কেন? কেন? কেন?

কেন? এর মাঝে আমার অনভুতি ৩টি :

অনভুতি-১ : এই দরবারের যারাই আছেন বা ছোহবতে থাকেন-বেশী বেশী জিকিরের কারণে তাদের অন্তরে আল্লাহ ও তার রাসুলের মহব্বত এবং ভয়ে চোখের পানি বেশী। যার কারণে তাকওয়ার পরিনতি খুলুছিয়াতও বেশী।

অনুভুতি-২: এই তরিকার পূর্বসূরী বড় বড় আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গদের নেছবত ও তাদের অনুসরণ লক্ষনীয়।

অনুভুতি-৩: পীর সাহেব চরমোনাই খানকার পীর হয়েও ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে রাজপথে মিছিল, সমাবেশ ও সংগ্রামে আছেন। আছেন আর্তমানবতার খেদমতে। আছেন তা‘মুরুনা বিল মারুফ ও ওয়াতান হাওনা আনীল মুনকারের প্রকাশ্য ঈমানী দায়িত্ব পালনে।

আমার জোরাল অনুভুতি-৩ এর কারণেই হয়ত আজ চরমোনাই উচ্চতার স্বর্ণ শিখরে এগিয়ে যাচ্ছে।

অনেক হক্কানী ও নামী-দামী পীর বা খানকা দেশে আরো আছে....কিন্তু তারা তারাই আছে..........। সারা বাংলাদেশে এককভাবে এবং হাজার বাঁধার মাঝেও চরমোনাই ছুটছে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার আলোকে একটি মিশন বাস্তবায়নের পথে।

চরমোনাই‘র মাহফিল হল চোখের পানিতে সিক্ত এক মাঠ যেখানে পদার্পন করলে বা বিচরণ করলে আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত নেয়ার সুযোগ হয়। আমি মনে করি আমাদের ব্যক্তিগত দাওয়াতে ১০০ দিনে যে ফলাফল তৈরী না হয়, একজন লোককে চরমোনাই‘র মাঠে নিয়ে গেলে আর সেখানে তিন দিন রাখতে পারলে তার চেয়ে বেশী ফায়দা বা উপকার হয়। অর্থাৎ হেদায়েতের নেয়ামত তাড়াতাড়ি নছিব হয়। এ জন্যই  মরহুম শায়েখ রহ. বলতেন, চরমোনাই‘র মাঠের বরকতই আলাদা।

দোয়া চাই আমীরুল মুজাহিদীন পীর সাহেব চরমোনাই দা.বা এবং এই তরিকা বা আন্দোলনের সকল মুরব্বীদের জন্য। যাদের মেহনত ও একাগ্রতাই উম্মতের কাঙ্খিত কামনা বাস্তবায়নের পথ সহজ হতে পারে।

 

মাওলানা লোকমান হোসাইন জাফরী

কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ